কমলাকান্ত ভট্টাচার্য
শাক্ত পদাবলীর আরেকজন বিশিষ্ট কবি হলেন কমলাকান্ত ভট্টাচার্য । তিনি রামপ্রসাদের মতোই খ্যাতি লাভ করেছেন এবং স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। তার ভক্তিরস, সঙ্গীত রস ও কবিত্ব শক্তিতে তিনি রামপ্রসাদের সমতুল্য।
জন্ম ও বংশ পরিচয়
কমলাকান্তের জন্ম হয়েছিল সম্ভবত ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমান জেলার অম্বিকা কালনায় । তার পারিবারিক উপাধি ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়।
পিতার নাম ছিল - মহেশ্বর এবং মাতার নাম- মহামায়া
বাল্যকালে পিতৃ বিয়োগ হলে মা মহামায়াদেবী দুই শিশু পুত্র কমলাকান্ত ও শ্যামাকান্তকে নিয়ে পিত্রালয়ে আসেন। মহামায়াদেবী কমলাকান্তকে পড়াশোনার জন্য টোলে ভর্তি করে দেন। টোলে পড়াশোনার পাশাপাশি কমলাকান্ত গোপনে সাধন ভজন অনুশীলন শুরু করেন।
কর্ম ও ব্যক্তি জীবন
কমলাকান্তের চরিত্র ও পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে বর্ধমান রাজরা তাকে বিশেষ ভক্তি করতেন । বর্ধমান মহারাজা তেজশ্চন্দ্র তাকে গুরু রুপে বরণ করে নেন এবং কোটালহাটে কমলাকান্তের সাধন ভজনের জন্য মন্দির করে দেন। সেখানে কমলাকান্ত কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পঞ্চমুন্ডীর আসনে বসে সাধনা করতেন।
কমলাকান্তের জীবন কথা সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেক অলৌকিক গল্প কাহিনী । শোনা যায় - দেবী কালিকা নাকি তাঁকে বাগ্দিনীর বেশ ধরে তাঁকে মাছ দিয়ে গেছিলেন । দস্যু দল তাকে মেরে ধরে টাকা করে নিতে এসে তার গানই মুগ্ধ হয়ে তার চরণে স্মরণ নিয়েছিলেন । তাকে মায়ের কাছে বলি দেবার আগে দস্যু সর্দার তাঁর শেষ ইচ্ছা মত গান করতে সুযোগ দেন ।
সুযোগ পেয়ে কবি-
" আর কিছু নাই শ্যামা !
কেবল তোমার দুটি চরণ রাঙা "
গানটি করলে , দস্যু দল মুগ্ধ হয়ে যান এবং তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন ।
সাহিত্য সাধনা
কমলাকান্ত সাধন তত্ত্ব বিষয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন , গ্রন্থটি হল "সাধকরঞ্জন" । এটি তন্ত্র সাধনার বই । এছাড়া তিনি কিছু বিশুদ্ধ বৈষ্ণব কবিতাও লেখেন , কিন্তু কমলাকান্তের খ্যাতি প্রকৃতপক্ষে তার শাক্ত পদগুলির জন্যই ।
কমলাকান্তের ভনিতায় যদিও প্রায় ৩০০ পদ পাওয়া গেছে, তবে বর্ধমান রাজবাটি প্রকাশিত কমলাকান্তের পদাবলী সংগ্রহে মোট ২৬৯ টি পদ ছিল , যার মধ্যে ২৪৫ টি শ্যামা বিষয়ক , এবং ২৪টি বৈষ্ণব ভাবাপন্ন রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক । যদিও তার মধ্যে আগমনী ও বিজয়া পর্বের গানগুলি অতি চমৎকার, এখানে তিনি রামপ্রসাদের চেয়েও উৎকৃষ্ট ।
আগমনী পর্যায়ের পদ
১) আমি কি হেরিলাম নিশি স্বপনে..
২) ওহে গিরিরাজ গৌরী অভিমান করেছে..
৩) গিরিরানী , এই নাও তোমার উমারে...
৪) " যাও গিরিবর হে , আনো মেয়ে নন্দিনী ভবনে আমার/
গৌরী দিয়ে দিগম্বরে কেমনে রয়েছ ঘরে "
৫) " আজি কালি করি দিবস যাবে, প্রাণের উমারে আনিবে কবে ?
প্রতিদিন কি হে আমারে ভুলাবে , একি তব অবিচার || "
বিজয়া পর্যায়ের পদ
১) " ওরে নবমী নিশি , না হইওরে অবসান
শুনেছি দারুন তুমি , না রাখ সতের মান "
২)" আমি হে রাজার নারী , ইহা কি সহিতে পারি ?
সোনার পুতুলি দিলে পাথারে ভাসায়ে ! "
৩) " ফিরে চাওগো উমা তোমার বিধিমুখ হেরি
অভাগিনী মায়েরে বধিয়ে কোথা যাও গো ? "
৪) আমার গৌরীরে লয়ে যায় ঘর আসিয়ে...
ভক্তের আকুতি পর্যায়ের পদ
১) "শুকনো তরু মুঞ্জরেনা , ভয় লাগে মা ভাঙ্গে পাছে"
২) " জানি , জানি গো জননী , যেমন পাষাণের মেয়ে !
আমারই অন্তরে থাক মা , আমারে লুকায়ে "
মৃত্যু বরণ
কমলাকান্তের মৃত্যুর ব্যাপার নিয়েও একটি প্রবাদ রয়েছে-
তার মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে মহারাজা তেজশ্চন্দ্র চেয়েছিলেন হিন্দু রীতি অনুসারে তাঁকে গঙ্গা তীরে নিয়ে যেতে , কিন্তু তাকে এ কথা বলার পর তিনি নাকি মুমূর্ষ অবস্থাতেই মহারাজকে জানিয়েছিলেন তিনি সৎ মাতার কোলে আশ্রয় নিতে চান না ।
" কি গরজ ? কেন গঙ্গাতীরে যাব ?
আমি কেলে মায়ের ছেলে হয়ে ,
বিমাতার কি স্মরণ লব ? "
উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় তৃতীয় দশকে আনুমানিক ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে , প্রায় ৫০ বছর বয়সে কবি কমলাকান্ত দেহত্যাগ করেন ।

0 Comments