রামপ্রসাদ রামপ্রসাদ সেন সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বে আমরা শাক্ত পদাবলী কাকে বলে, কিভাবে শাক্ত পদাবলীর উদ্ভব হলো এবং এই পর্যায়ের কবি সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা নেব, তারপর রামপ্রসাদ সেন সম্পর্কে একটি বিস্তারিত আলোচনা মধ্যে চলে যাব
শাক্ত দাবলী কাকে বলে
অষ্টাদশ শতাব্দীর উল্লেখযোগ্য কাব্য বৈচিত্র পাওয়া যায় শাক্ত পদাবলীর মধ্যে । শক্তি দেবী অর্থাৎ উমা-পার্বতী-দুর্গা- কালিকাকে কেন্দ্র করে যে গান রচিত হয় তাকে বলা হয় শাক্ত গান৷ শাক্ত গানকে সেকালে বলা হতো- 'মালসী'। মালবশ্রী রাগে এই গান গাওয়া হতো বলেই মনে করা হয় – এর নাম মালসী ছিল।শাক্ত পদাবলী উদ্ভবের কারণ
অষ্টাদশ শতাব্দী ও তৎকালীন সময়ে চলতে থাকে এক চরম বিশৃঙ্খলা, অত্যাচার অবিচার। চতুর্দিকে সে এক 'মাৎসন্যায় এর মত অবস্থা। এ সময়েই শুরু হয় ফিরিঙ্গি মগ ও পর্তুগিজ দস্যুদের হামলা। এই অত্যাচার ও অবিচারের সংকটময় অবস্থায় বিপন্ন মানুষ দিশেহারা হয়ে এক শক্তি দেবীর আশ্রয় নেন। যে শক্তি সব বিপদ আপদ থেকে তাদের উদ্ধার করবে। ভয় থেকে নিয়ে যাবে অভয়লোকে। সেই পরম নির্ভয় করুণাময়ী জগৎজননীর উপাসনারই আরেক নাম শাক্তসাধনা। আর সেই সাধনার অঙ্গ হিসাবেই সাধক পদকর্তাগণ শাক্ত দেবীর উদ্দেশ্যে গান রচনা করেছিলেন, সেগুলো হল শাক্তপদাবলী।
অর্থাৎ অষ্টাদশ
শতাব্দীতে অরাজকতাপূর্ণ জীবন যাত থেকে মুক্তি লাভের আশায় মানুষ আদ্যাশক্তির স্মরণ
নিয়েছিল এবং তা থেকেই জন্ম শাক্ত পদালী।
শাক্ত পদাবলীর বিভাগ
শাক্তপদ গুলি কে প্রধানত দুটি শাখায় বিভক্ত করা হয় ১) হর ও পার্বতীর পারিবারিক জীবন আশ্রিত আগমনী ও বিজয়ার সংগীত ২) কালিকা বা শ্যামার মাতৃরূপের ভজন বিষয়ক সংগীতশাক্ত পদাবলীর কবিগন
কালিকা বা শ্যামার মাতৃরূপের ভজন বিষয়ক সংগীত রচনার ক্ষেত্রে যে সমস্ত কবিগণ উল্লেখযোগ্য তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন - রামপ্রসাদ সেন এবং কমলাকান্ত ভট্টাচার্যআজকে আমাদের পাঠ্য - শাক্ত পদাবলীর কবি রামপ্রসাদ সেন
রামপ্রসাদ সেন
বাংলা সাহিত্যে শাক্ত গীতি কাব্যের প্রবক্তা ও এ ধারার শ্রেষ্ঠ কবি হলেন রামপ্রসাদ সেন । তিনি ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর এক বিশিষ্ট বাঙালি শাক্ত কবি ও সাধক। বাংলা ভাষায় দেবী কালীর উদ্দেশ্যে ভক্তিগীতি রচনার জন্য তিনি সমধিক পরিচিত । তার রচিত গানগুলি "রামপ্রসাদী" গান নামে জনপ্রিয়।জন্ম ও বংশ পরিচয়
অষ্টাদশ শতকদের গোড়ার দিকে ২৪ পরগনা জেলার হালি শহরের অন্তর্গত কুমারহট্ট গ্রামে কবিরাজ বংশে রামপ্রসাদ সেন জন্মগ্রহণ করেন। পিতা- রামরাম সেন (আয়ুর্বেদিক ঔষধ ব্যবসায়ী) ও মাতা সিদ্ধেশ্বরী দেবী কবি দুই পুত্র রামদুলাল ও রামমোহন, এবং দুই কন্যা- পরমেশ্বরী ও জগদীশ্বরী ।পিতামহ রামেশ্বর সেন এবং প্রপিতামহ ছিলেন কৃত্তিবাস সেন । যদিও তার আবির্ভাব কাল নিয়ে মতান্তর রয়েছে । তবে রামপ্রসাদ সেনের জীবনী সংগ্রাহক গুপ্ত কবি ঈশ্বর গুপ্তের মতে ১৭২০-২১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রামপ্রসাদ সেন জন্মগ্রহণ করেন । কবিরঞ্জন বা রামপ্রসাদ সেনের জন্ম সাল নিয়ে মতবিভেদ থাকলেও জন্মস্থান নিয়ে মতবিভেদ নেই-
"ধরাতলে ধন্য সে কুমারহট্ট গ্রাম
তার
মধ্যে সিদ্ধ পিঠ রামকৃষ্ণ ধাম
শ্রীমন্ডপ জাগ্রত শৈলেশ পুত্রী যথা
নিশাকালে চরিতার্থ
শ্রীরঞ্জন তথা"
নিশাকালে চরিতার্থ শ্রীরঞ্জন তথা"
কর্মজীবন
পিতার মৃত্যুর পর সংসারে অজচ্ছলতা দেখা দিলে কবি ১৭-১৮ বছর বয়সে কলকাতা যান এবং জমিদারের কাছে রেখে মুহুরীর চাকরি গ্রহণ করেন। এ সময় থেকেই তিনি গান লিখতেন এবং গাইতেন । জমিদার তার গানের প্রতি ভাতে খুশি হয়ে মাসিক ৩০ টাকা বৃত্তি দিয়ে গ্রামে পাঠিয়ে দেন শাক্ত সাধনার জন্য। গ্রামে ফিরে এসে রামপ্রসাদ এর নিচেই গান লিখতে এবং নিজেই শুরু করে গাইতেন আর সেই থেকেই তার গানের সুর - "প্রাসাদি সুর" নামে পরিচিত ।সে সময় নবদ্বীপের রাজা ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র রায় , যিনি রামপ্রসাদের কবিত্ব খ্যাতির কথা শুনে নিজ সভায় ডেকে পাঠান । ভারতচন্দ্র তখন কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ছিলেন। নবদ্বীপ রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রামপ্রসাদের কবিতে মুগ্ধ হয়ে ১০০ বিঘা জমি দান করেন এবং "কবিরঞ্জন" উপাধিতে ভূষিত করেন । রামপ্রসাদ সেন তার বিদ্যাসুন্দর কৃষ্ণচন্দ্রকে উৎসর্গ করেন ।
বাস্তব জীবনের কর্মযুগের সঙ্গে আধ্যাত্মিক সাধনার এক অপূর্ব মিলন চিত্র দেখা যায় রামপ্রসাদের গানে , তাই তিনি লিখেছিলেন-
"মন রে কৃষিকাজ জানো না/এমন মানব জমিন রইল পতিত"
কিংবা
"মা আমায় ঘুরাবি
কত/ কলুর চোখ ঢাকা বলদের মতো"
রামপ্রসাদের রচনাবলী
রামপ্রসাদ সেন "বিদ্যাসুন্দর" এবং "কৃষ্ণকীর্তন" নামে কাব্য লিখেছিলেন। কিন্তু তার খ্যাতি মূলত কালী কীর্তনের জন্য । তার রচিত কালি কীর্তনের সংখ্যা প্রায় ৩০০ । তার সঙ্গীত গুলিকে নিম্নলিখিত শ্রেণীতে ভাগ করা যায়-
১. উমা বিষয়ক (আগমনী ও বিজয়া)
২. সাধন বিষয়ক (তন্ত্র
নির্ভর সাধনা)
৩. জগত জননীর রূপ ও স্বরূপ বিষয়ক
৪. তথ্য দর্শন ও নীতি বিষয়ক
এর
মধ্যে উমা বিষয়ক আগমনী ও বিজয়া পর্যায়ের পদের সংখ্যা সামান্য। সাধন বিষয়ক পদে
কবি নানা উপমার রূপকের মধ্য দিয়ে নিজের সাধনার কথা আভাসে ব্যক্ত করেছেন। তত্ত্ব ও
নীতি বিষয়ক পদ শুষ্ক নীতি ও নিষ্করন বৈরাগ্যের জন্য বিশেষ ভাবে স্মরণীয় নয় ।
কিন্তু জগৎ জননী কিংবা আদ্যাশক্তির স্বরূপ বর্ণনায় ও বাৎসল্য লীলা সংক্রান্ত পদে
রামপ্রসাদের তুলনা নেই । রামপ্রসাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ
আগমনী পর্যায়
"গিরি এবার আমার উমা এলে , আর ওমা পাঠাবো নাবলে বলবে লোকে মন্দ কারো কথা শুনবো না ।
যদি এসে মৃত্যুঞ্জয় উমা নেবার কথা কয়--
এবার মায়ের ঝিয়ে করব ঝগড়া, জামাই বলে মানবো না"
বিজয়া পর্যায়
"তনয়া পরের ধন,
বুঝিয়া না বুঝে মন হায় হায় একি বিরম্বনা
বিধাতার "
"ওহে প্রাণনাথ গিরিবর হে/ভয়ে তনু কাঁপিছে আমার"
জগৎ জননীর স্বরূপ বিষয়ক পদ
"শুনেছি মা'র বরণ কালো/সে কালোতে ভুবন আলো"
"শ্মশানে বাস, অট্টহাস , কেশপাশ
কাদম্বিনী/
বামা সমরে বরদা , অসুর দরদা , নিকটে প্রমোদা প্রমাদগণি"
ভক্তের আকুতি পর্যায়
১) "কেবল আশার আসা, ভবে আসা, আসা মাত্র হলযেমন চিত্রের পদ্মেতে থেকে পড়ে, ভ্রমর ভুলে র'লো"
২) "মা নিম খাওয়ালে চিনি বলে, কথায় করে ছলো
ওমা মিঠার লোভে তিতো মুখে সারাদিনটা গেল"
৩) " শুকনো তরু মুঞ্জড়রেনা , ভয় লাগে মা ভাঙ্গে পাছে"
৪) মাগো তারা ও শঙ্করী
কোন অবিচারে আমার পরে করলে দুঃখের ডিক্রী জারি?
৫) "মা আমায় ঘুরাবে কত
কলুর চোখ ঢাকা বলদের মতো"
৬) "আমায় দাও মা তবিলদারী
আমি নিমক হারাম নই সঙ্করী"
৭) "এমন দিন কি হবে তারা
যবে তারা তারা বলে, তারা বেয়ে পড়বে ধারা"
🌼 বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর পর্বের জন্য আমাদের ইউটিউব চ্যানেলের ভিডিওটি দেখুন ।
♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️

0 Comments