বাংলার ঋতু বৈচিত্র্য / বাংলার ঋতুচক্র
সকল দেশের রানী
আমাদের এক কবি একদা আমাদের জন্মভূমিকে ‘সকল দেশের রাণী' বলে বন্দনা সকল দেশের রাণী করেছিলেন। কেননা, আমাদের এই বাংলাদেশের মত প্রাকৃতিক বৈভব আর কার আছে? –কার আছে ঋতুতে ঋতুতে এমন নতুন নতুন শোভা ? —এদেশ রাণী নয়তো, আর কে?
১) ঋতু ও ঋতুর ফসল
আমাদের এই বাংলাদেশে ঋতুর ক্রম-বিবর্তন সত্যিই বড়ো সুন্দর। ইউরোপ হল শীতের দেশ, দিনের পর দিন সেখানে আকাশ থাকে কুয়াশায় ঢাকা । আকাশ থেকে ঝরে পড়ে কেবল তুষার আর তুষার । ওদের দেশের কবি তাই অসহিষ্ণু হয়ে বসন্তদিনের জন্য অপেক্ষা করেন; বলেন, 'শীত যখন এসে পৌঁচেছে, বসন্ত কি তখন আর দূরে থাকতে পারে?' – আমাদের দেশে শীত কিন্তু ঐভাবে বর্জনীয় নয়। এখানকার শীতে মাঝে মাঝে হাড়-কাঁপানো কনকনানি এবং হাড়ে হাড়ে ঠোকাঠুকি লগিয়ে দিলেও, তুষারের কামড় কখনো পাওয়া যায় না। বরং আমাদের দেশে শীত কিঞ্চিৎ উপভোগ্য। কমলা-আপেল-আঙুরে আমাদের সকালের প্রাতরাশ শীতেই ভালোই জমে। আমাদের চারিদিকে গোলাপ-গাঁদা ইত্যাদি মরশুমী ফুলের তখন ছড়াছড়ি। বেশিরভাগ দিনই থাকে উজ্জ্বল। আকাশ নির্মেঘ। মাঝে মাঝে আমলকীর ডালে ডালে লাগে শীতের হাওয়ার নাচন। তা এই সময় আমাদের ঘরে ঘরে ধানের ফসল ওঠে। ‘রোদের সোনা ছড়িয়ে পড়ে মাটির আঁচলে' এবং শোনা যায় পৌষের ডাক।
২) বসন্ত
ঋতুচক্রের আবর্তনে শীতের পরেই আমরা দেখা পাই বসন্তের। শীতের শেষে ফাল্গুন আসার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে চোরা গরম দেখা দেয়। বয় মধু-বাতাস। বঙ্গ জননীর সোনার আঁচল এই সময় ভরে যায় নানা রঙের ফুলে। পলাশে-শিমুলে যেন আগুন লাগে। মল্লিকা-মালতীর গন্ধে ভারি হয়ে ওঠে ফাল্গুন রাতের বাতাস। শোনা যায় মধুপের গুঞ্জন, কোকিলের ডাক। কবির ভাষায়, সেদিন বকুল গন্ধে বন্যা আসে' এবং
" ফাগুন হাওয়ায়
রঙে রঙে
পাগল ঝোরা
লুকিয়ে ঝরে,
গোলাপ জবা
পারুল পলাশ
পারিজাতের
বুকের পরে। "
৩) গ্রীষ্ম
বসন্ত যেমন হঠাৎ আসে, তেমনি হঠাৎ চলে যেতেও দেরী করে না। বসন্তের পর আসে গ্রীষ্মের আধিপত্য। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ দুটি মাস ধরে চলে প্রচণ্ড দাবদাহ। এর নাম গ্রীষ্ম কাল । দুপুরটা দারুণ গরমে মাঝে মাঝে দুঃসহ হয়ে ওঠে, তবে রাত্রিটা ভারি মনোরম। পাকা আমের বৈভব আছে গ্রীষ্ম কালে । আছে কালো জামের নিবিড় মাধুর্য। আর আছে ‘কালবৈশাখী'র মত্ততা। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে গাছপালার ওপর দিয়ে ঝড় তুলে সে হঠাৎ এসে হাজির হয়। হঠাৎ হঠাৎ সে বিস্তর তাণ্ডব বাধিয়ে বসে, ভেঙে ফেলে আস্ত গাছের ডাল । খড়ের চালা উড়িয়ে দেয়। নদীবক্ষে নৌকাডুবি ঘটায়। অর্থাৎ আনে বর্ষার বার্তা। কাল বৈশাখী হল আসলে বর্ষারই বর্ষা দূত ।
৪) বর্ষা
বর্ষা-ঋতুর আগমনের ভেতর বেশ একটু আড়ম্বর আছে। ছায়া- উত্তরীয় উড়িয়ে দিয়ে আকাশকে মেঘ-মেদুর করে বর্ষা আসে। দাবদাহের ক্লান্তি সে মুহূর্তে ঘুচিয়ে দেয়। রিমঝিম বর্ষা দিনরাত্তির আমাদের কানে যেন সেতার বাজিয়ে চলে। আমাদের মন এই সময় হয়ে ওঠে মেঘের সঙ্গী। কবির ভাষায় আমরা বলে উঠি -
‘মন মোর মেঘের সঙ্গী
উড়ে চলে দিগ্ দিগন্তের পানে
নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণ বর্ষণ সঙ্গীতে
রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম।'
৫) শরৎ
বর্ষারসংগীতে ‘রিমঝিম’বাজে, আর দেখতে দেখতে সবুজ হয়ে ওঠে ধরিত্রী। বঙ্গজননী হয়ে ওঠেন শ্যামাঙ্গী, শস্যশ্যামলা। এই সময় ভরে যায় নদী-নালা। এর পরেই হঠাৎ একদিন দেখা পাওয়া যায় শরতের। আকাশ নির্মেঘ হয়। সোনার রং ধরে শরতের রোদ্দুরে। আসে শারোদৎসব। দুর্গা পুজোয় সারা দেশ মেতে ওঠে। আসে ছুটি। আপিস-কাছাড়িতে ছুটি। স্কুল-কলেজ বন্ধ। চারদিকে শুধু অবকাশ ও আনন্দের জোয়ার। —শরৎকালটি বড়ো মনোরম। শেফালির গন্ধে শরৎকালটি বড়োই মাতোয়ারা।
৬ ) শীত
আশ্বিন ফুরোতে না পুরোতে শোনা যায় শীতের আগমন বার্তা । তবে শরৎ আর শীতের মাঝে রয়েছে হেমন্ত । মৃদুমন্দ বাতাসে পাতা ঝরিয়ে হেমন্ত আহ্বান জানায় শীতকে ।
৭) ঋতুর মাতৃ বন্দনা
আমাদের এই বাংলাদেশে ঋতুচক্রের আবর্তনটা সত্যিই অপূর্ব । কোনো ঋতুই দীর্ঘস্থায়ী নয়। এরা কেবল বদলায়। এই বিবর্তনের ফলে কেবল যে ঋতুর রং বদল হয় তা নয় , আমাদের খাদ্য রুচিরও পরিবর্তন হয়। ঋতুতে ঋতুতে বঙ্গজননীর আঁচল ভরে ওঠে নানা ধরনের ফলে ও ফসলে। আর ফুলেরত কথাই নেই। প্রকৃতির ভেতর এমন ঐশ্বর্যের ভাণ্ডার আর কোথাও কি পাওয়া যাবে? –ঋতুচক্রের এই পরিবর্তন আছে বলেই আমাদের ‘জন্মভূমি ’হতে পেরেছে ‘সকল দেশের রাণী'।
বিদেশীদের কাছেও আমাদের জননী মূর্তিমতী সৌন্দর্যলক্ষ্মী। —ছয়টি ঋতুর পোশাকে তিনি সত্যি সত্যিই 'ভুবনমনোমোহিনী'। বাংলার ঋতুচক্র নতুন নতুন ডালি সাজিয়ে নতুন উপচারে আমাদের মাকে চলেছে বন্দনা করে। এই দিক থেকে বিচার করলে বাংলার ঋতুগুলি বাংলা মায়ের সার্থক সেবিকা। ঋতুতে ঋতুতে মাকে সাজিয়ে তোলাই এদের কাজ। বারবার ফিরে ফিরে এবং ভেঙে ভেঙে এই অদ্ভুত খেলা খেলে চলেছে আমাদের ঋতুচক্র, যুগের পর যুগ। —কিছুতেই যেন স্বস্তি পাচ্ছে না—ঐ চিরন্তন অতৃপ্তিই বাংলা ঋতুচক্রে যুগ যুগ ধরে চলেছে আবর্তিত হয়ে।
------_-----_------_------_------_------_-------_------_------_------
তথ্যসূত্র - ডক্টর বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের - " বাংলা মাধ্যমিকী "

0 Comments