মালাধর বসু ও তার কাব্য
অনুবাদ সাহিত্যিক মালাধর বসু ও তার কাব্য শ্রীকৃষ্ণবিজয় সম্পর্কে জানার আগে আমাদের জেনে নেওয়া দরকার অনুবাদ সাহিত্যের আবির্ভাব হলো কি করে বা কেন ।
অনুবাদ সাহিত্যের আবির্ভাবের কারণ
১২০৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে যে তুর্কি আক্রমণ ঘটে এর ফলে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের মধ্যে , তারা হিন্দু ধর্ম ছেড়ে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করে । কারণ এসময় একদিকে হিন্দু শাসনতন্ত্রের অবসান ঘটে ও ইসলামী শাসনতন্ত্রের শুরু হয় এবং অন্যদিকে উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নিরন্তর অবহেলা নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের মনে এক বিশৃঙ্খলা অবস্থার সৃষ্টি করে।এই পরিস্থিতিতে পৌরাণিক হিন্দু ধর্মের আদর্শকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন কবিরা প্রাচীন হিন্দু ধর্মগ্রন্থ গুলি সংস্কৃত ভাষা ভাষা থেকে বাংলায় সহজ সরল ভাবে অনুবাদ করে নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে থাকেন- যাতে করে তারা নিজেদের ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত হতে পারে -
" লোক বুঝাইতে কইলা কৃত্তিবাস পন্ডিত "
মালাধর বসু ও একই কারণে ভাগবতের অনুবাদ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন -
" লোক নিস্তারিতে গাই পাঁচালী রচিয়া "
আবার অনেকে মনে করেন - ইসলামী শাসন শুরু হলেও ইসলামী রাজারা ছিলেন হিন্দু প্রজা মণ্ডলী দ্বারা পরিবৃত । তাই তারা ইচ্ছা এবং অনিচ্ছায় হিন্দু সংস্কৃতির সাথে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন। দীনেশ চন্দ্র সেন এর মতে- মুসলমান শাসকরা হিন্দুধর্মের প্রাচীন আচার ব্যবহার সম্পর্কে কৌতুহলী হয়ে পড়েন, ফলে তারা সেসব জানার জন্য তাদের সভা কবিদের দ্বারা প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রের অনুবাদ করাতেন ।
ইলিয়াস শাহী বংশের ভূমিকা এ ব্যাপারে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ।
প্রধানত এইসব কারণেই প্রাচীন অনুবাদ সাহিত্যের সৃষ্টি
অনুবাদ সাহিত্যের শ্রেণীবিভাগ
অনুবাদ সাহিত্যকে প্রধানত তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয় -১) রামায়ণ 👇
(কৃত্তিবাস ওঝা , অদ্ভুত আচার্য , চন্দ্রাবতী, ভবানী দাস, ঘনশ্যাম দাস, শংকর কবিচন্দ্র , )
২) ভাগবত 👇
(মালাধর বসু , যশোরাজ খান , রঘুনাথ পন্ডিত , কবিশেখর রায়, পরশুরাম চক্রবর্তী , শংকর চক্রবর্তী কৃষ্ণ দাস )
৩) মহাভারত 👇
(কবীন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী , কাশীরাম দাস , নিত্যানন্দ ঘোষ , দ্বিজ অভিরাম , দ্বৈপায়ন দাস )
ভাগবতের সূচনা
ভাগবত অনুবাদের সূচনা চতুর্দশ শতাব্দীর শেষে বা পঞ্চদশ শতকের শুরুতে । লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ষোড়শ শতাব্দীর পর ভাগবত অনুবাদের স্রোত অনেকটা কমে যায় , কেননা এ সময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এক অমৃতময় বৈষ্ণব ধর্ম প্রচলন করেন যার ফলে শ্রীকৃষ্ণের মধুর রস নাম কীর্তন প্রাধান্য পেতে শুরু করে, কিন্তু ভাগবতের মধ্যে ছিল ঐশ্বর্য রসে প্রকাশ , তাই ষোড়শ শতাব্দীতে ভাগবত অনুবাদের স্রোত ম্লান হয়ে আসে।
তবে চৈতন্য দেবের আবির্ভাবের পূর্বে ভাগবতের অনুবাদ করেন মালাধর বসু । তাই তার কাব্য শ্রীকৃষ্ণ বিজয় অনেকটা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে ।
যাই হোক প্রথমে আমরা মালা ধর বসু সম্পর্কে জেনে নেব এবং এরপর তার কাব্য শ্রী কৃষ্ণ বিজয় সম্পর্কে জানব।
মালাধর বসুর জন্ম ও বংশ পরিচয়
প্রাক চৈতন্য যুগের কবি তথা ভাগবত পুরাণের আদি অনুবাদক মালাধর বসুর আবির্ভাব কাল সম্পর্কে কিছু সংশয় রয়েছে । তবে অধিকাংশ সাহিত্য সমালোচকের মতে পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি । কেননা মালাধর বসু নিজে গ্রন্থ রচনা কাল নির্দেশ করতে গিয়ে -১৩৯৫ শকাব্দে গ্রন্থ আরম্ভ এবং ১৪০২ শকাব্দে গ্রন্থ সমাপনের কথা উল্লেখ করেছেন।
কাব্যে কবির ব্যক্তিগত পরিচয় থেকে জানা যায়- - তিনি বর্ধমান জেলার কুলীন গ্রামে কায়স্থ বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পিতার নাম ভগিরথ , মাতা ইন্দুমতি এবং পুত্র সত্যরাজ খাঁ । পৌত্র ভক্ত কবি রামানন্দ বসুর সঙ্গে চৈতন্যদেবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
মলধর বসু গৌড়েশ্বর রুকনউদ্দিন বরবক সাহের অত্যন্ত প্রিয় পাত্র ছিলেন । শ্রীকৃষ্ণ বিজয় কাব্য সম্পূর্ণ করার পর কবির অসাধারণ কবিত্ব শক্তির পুরস্কার স্বরূপ গৌরের সুলতান কবিকে "গুনরাজ খাঁ" উপাধি দান করেছিলেন । তাই কবি লিখে ছিলেন-
"গৌড়েশ্বর দিলা নাম গুণ রাজ খান "
কাব্য পরিচয়
মালাধর বসুর অনূদিত কাব্যটি "শ্রীকৃষ্ণ বিজয়" নামে পরিচিত । তবে কোন কোন গ্রন্থে "গোবিন্দ বিজয়" বা "গোবিন্দ মঙ্গল" বলেও উল্লিখিত । পণ্ডিতদের মধ্যে কাব্যটির নাম নিয়েও একটু বিতর্ক রয়ে গেছে ।কাব্যটি বাংলা সাহিত্যের সাল তারিখযুক্ত প্রাচীনতম গ্রন্থ।
কাব্যটির রচনাকাল সম্পর্কে কবি জানিয়েছেন -
তেরশ পঁচানই শকে গ্রন্থ আরম্ভন।
চতুর্দশ দুই শকে হৈল সমাপন।।”
অর্থাৎ মালাধর বসু ১৩৯৫+৭৮ = ১৪৭৩ খ্রীঃ তাঁর 'শ্রীকৃষ্ণবিজয়' গ্রন্থের রচনা শুরু করেন এবং ১৪০২+৭৮ = ১৪৮০ খ্ৰীঃ সমাপ্ত করেন।
শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্যের কাহিনী তিনটি খন্ডে বিনষ্ট -
১) আদিখন্ড বা বৃন্দাবন লীলা
২) মধ্য খন্ড বা মথুরা লীলা
৩) অন্ত খন্ড বা দারোকা লীলা
আদিখণ্ড বা বৃন্দাবন লীলায় রয়েছে - কংসের অত্যাচারের হাত থেকে জগৎবাসীকে বাঁচানোর জন্য কংসের কারাগারে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম লাভ । গোকুলের ননদের গৃহে কৃষ্ণের প্রতিপালন। ইন্দ্রযজ্ঞ নিষেধ , পুতনা রাক্ষসীর বধ , রাস অনুষ্ঠান প্রভৃতি।
মধ্য খন্ড বা মথুরা নিলায় রয়েছে - কৃষ্ণ-বলরাম কর্তৃক কংসের পিতা ধার্মিক উগ্রসনের মুক্তি ও মথুরার সিংহাসনে পুনঃ প্রতিষ্ঠা, জরাসন্ধ বধ , সন্দীপনীর আশ্রমে গমন , উদ্ধবকে বৃন্দাবনে প্রেরণ , কৃষ্ণ ও বলরামের দ্বারকায় প্রত্যাবর্তন প্রভৃতি ।
অন্ত খন্ড বা দ্বারকা লীলায় রয়েছে - রুক্মিণী হরণ কাহিনী , সত্যভামার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের বিবাহ , শিশুপাল বধ , যদু বংশের অভিশাপগ্রস্থ হওয়া , দ্বারকাকে সমুদ্রের গ্রাস , যদুবংশের ধ্বংস , কৃষ্ণের অনুত্যাগ প্রভৃতি ঘটনা ।
কাব্যের গুরুত্ব
শ্রীকৃষ্ণবিজয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে মালাধর বসু রচিত একটি বাংলা কাব্য। বাংলা সাহিত্যে প্রথম সাল তারিখযুক্ত গ্রন্থ এটি। হিন্দুদের অষ্টাদশ মহাপুরাণের অন্যতম ভাগবত পুরাণ অবলম্বনে রচিত হয়েছে এটি। এর অপর নাম গোবিন্দমঙ্গল কাব্য। এই কাব্যে কৃষ্ণের ঐশ্বর্যলীলা গুরুত্ব পেয়েছে।মালাধর বসুর আগে কেউই সংস্কৃত থেকে বাংলা বা অন্য কোনো আঞ্চলিক ভাষায় ভাগবত অনুবাদ করেননি। সেই অর্থে, মালাধর বসুই ভাগবত অনুবাদ-ধারার প্রবর্তক। তিনি মধ্যযুগের বাংলা ভাষায় প্রচলিত পাঁচালীর ঢঙে শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্য রচনা করেন। কৃত্তিবাস ওঝার শ্রীরাম পাঁচালীর মতো তার শ্রীকৃষ্ণবিজয়েও বাঙালিয়ানা ও বাঙালি সমাজের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।
ধন্যবাদান্তে
Sscbangla123
(অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি মার্জনা করবেন)

0 Comments