কৃষ্ণ দাস কবিরাজ
ষোড়শ শতকের পূর্বে বাংলা ভাষায় জীবনী ধর্মী রচনার সামান্য নিদর্শন মেলে । কিন্তু
ষোড়শ শতাব্দী থেকে বাংলা সাহিত্যে এমন একজনের জীবন কথা অবলম্বনে জীবনী কাব্য রচিত হতে শুরু করল যিনি কোন বস্তুগত সিংহাসনে আরোহন না করলেও সাধারণ মানুষের হৃদয় সিংহাসনে আরোহন করেছেন - তিনি হলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ।
এই শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনী অবলম্বনে যে সমস্ত গ্রন্থ রচিত হলো সেগুলি চৈতন্য জীবনী কাব্য নামে পরিচিত।
বাংলা সাহিত্যে চৈতন্য ভক্ত কবিরা চৈতন্যদেবের সম্পর্কে যে সমস্ত জীবনী কাব্য রচনা করেছিলেন সেগুলি হল -
১) বৃন্দাবন দাস - "চৈতন্য ভাগবত"
২) লোচ2ন দাসের- "চৈতন্য মঙ্গল"
৩) জয়ানন্দের - "চৈতন্য মঙ্গল"
৪) কৃষ্ণদাস কবিরাজের - "শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত"
যাইহোক আজকে আমাদের পাঠ্য কৃষ্ণদাস কবিরাজ ও তাঁর কাব্য শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত
জন্ম ও বংশ পরিচয়
কৃষ্ণদাস আনুমা: ১৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার অন্তর্গত ঝামটপুর গ্রামে, বৈদ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল ভগীরথ, এবং তাঁর মাতার নাম সুনন্দা।নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব ভক্ত কৃষ্ণ দাস ছিলেন নিত্যানন্দের শিষ্য ।
কাব্য রচনার প্রসঙ্গ / কারণ
জানা যায় দীক্ষাগুরু নিত্যানন্দের দাঁড়া স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে কৃষ্ণ দাস গৃহ ত্যাগ করে বৃন্দাবনে গিয়ে উপস্থিত হন।সেখানে বৈষ্ণব গোস্বামীদের কাছে বৈষ্ণব শাস্ত্র , দর্শন ও ভক্তিশাস্ত্র সম্পর্কে অধ্যায়ন করেন ।
বৃন্দাবনের আচার্য ও গুরুদের বিশেষ অনুরোধে তিনি চৈতন্যদেবের জীবনের অন্ত্যখণ্ড বিস্তারিত আকারে বর্ণনা করা সংকল্প করেন ...
বৃন্দাবন দাসকে কৃষ্ণ দাস অতিশয় ভক্তি করতেন , পাশে গোটা জীবনী কাব্য লিখলে বৃন্দাবন দাসের খ্যাতি ক্ষুন্ন হয় , তাই বৈষ্ণব আচার্যদের অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি সম্পূর্ণ চৈতন্য জীবনী কাব্য লিখতে সম্মত হননি । বৃন্দাবন দাস চৈতন্য জীবনের যে অংশটুকু সংক্ষেপে বলে গেছেন বাজিয়ে যে অংশ বাদ দিয়ে গেছেন কৃষ্ণদাস শুধু সেইটুকু রচনা করতে সম্মত হন ।
কাব্য পরিচয়
কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত গ্রন্থটির নাম- "শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত" । গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় রচিত শ্রেষ্ঠ চৈতন্য জীবনী কাব্য । কাব্যটি রচনাকাল নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে নানা রকম মতবিভেদ রয়েছে-ডক্টর সুকুমার সেনের মতে গ্রন্থটির রচনাকাল ১৫৬০- ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ।
ডক্টর অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এর মতে - ১৫৯০ খ্রিস্টাব্দের পর গ্রন্থটি রচনা শুরু হয়
ডঃ বিমান বিহারী মজুমদারের মতে - ১৬১২ - ১৬১৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কাব্যটি রচনা হয় ।
কাব্যটি { আদি- মধ্য- অন্ত } তিনটি লীলায় বিভক্ত । মোট পরিচ্ছেদ সংখ্যা ৬২
১) আদি খন্ড : ১৭ টি পরিচ্ছেদ রয়েছে ,
যার প্রথম ১২ টি পরিচ্ছেদ শুধু মুখবন্ধ বর্ণিত এবং শেষ পাঁচ পরিচ্ছেদে চৈতন্যের বাল্য লীলা , কৈশোর লীলা ও যৌবন লীলা খুব সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন২) মধ্য খন্ড : ২৫ টি পরিচ্ছেদ রয়েছে ,
যার প্রথম দুই পরিচ্ছেদে চৈতন্যের শেষ লীলার পূর্বাভাস দেওয়া আছে । এছাড়া সন্ন্যাস গ্রহণ , লীলাচলে প্রত্যাবর্তন , বৃন্দাবন গমন , কাশীতে ভক্তি প্রচার অর্থাৎ সন্ন্যাস গ্রহণের পর থেকে ৫ বছরের বিবরণ মধ্য লীলাতে বর্ণনা করেছেন।
৩) অন্ত খন্ড : ২০ টি পরিচ্ছেদ ,
যেখানে চৈতন্যদেবের মহাভাব বর্ণিত হয়েছে , অর্থাৎ মহাপ্রভুর জীবনের শেষ ১২ বছরের দিব্যোন্মাদ অবস্থার বর্ণনা রয়েছে এই পর্বে এবং মহাপ্রভু রচিত "শিক্ষাস্টক" কে ব্যাখ্যা করেছেন কৃষ্ণ দাস ।


0 Comments